গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া লোকজ উৎসব
হেনা শিকদার বাঙালির পরিচয় তার উৎসবে। এক সময় গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঋতু আসত নতুন নতুন উৎসবের বার্তা নিয়ে। মাঠ ভরা ধান, কলকলিয়ে বয়ে যাওয়া নদী আর মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে থাকত এসব লোকজ আয়োজন। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ সেই জৌলুস ফিকে হয়ে আসছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিন আর যান্ত্রিক কোলাহলে আমরা কি হারিয়ে ফেলছি আম
ইনসাইড ডেস্ক
Inside Bangla
২৭ মার্চ, ২০২৬
পড়তে ২ মিনিট

হেনা শিকদার
বাঙালির পরিচয় তার উৎসবে। এক সময় গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঋতু আসত নতুন নতুন উৎসবের বার্তা নিয়ে। মাঠ ভরা ধান, কলকলিয়ে বয়ে যাওয়া নদী আর মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে থাকত এসব লোকজ আয়োজন। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ সেই জৌলুস ফিকে হয়ে আসছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিন আর যান্ত্রিক কোলাহলে আমরা কি হারিয়ে ফেলছি আমাদের নিজস্ব সত্তা?
গ্রাম বাংলার চিরায়ত রূপের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অফুরন্ত উৎসবের এক রঙিন ক্যানভাস। “বারো মাসে তেরো পার্বণ” এই প্রবাদটি কেবল কথার কথা ছিল না, ছিল বাঙালির প্রাণের স্পন্দন। কিন্তু আধুনিকতা আর যান্ত্রিকতার প্রবল স্রোতে আমাদের সেই প্রাণের উৎসবগুলো আজ ধূসর হয়ে যাচ্ছে।
নবান্ন: নতুন ধানের ঘ্রাণে মাতোয়ারা গ্রামনবান্ন মানেই ছিল উৎসবের মহোৎসব। অগ্রহায়ণের নতুন ধান ঘরে তোলার পর শুরু হতো পিঠা-পুলি আর পায়েসের ধুম। বাড়ির উঠানে আল্পনা আঁকা, পাড়া-প্রতিবেশীকে নিমন্ত্রণ জানানো আর ঢেঁকির শব্দে মুখরিত হওয়া ছিল নবান্নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন ধান কাটার যন্ত্র এসেছে, কিন্তু সেই উৎসবের আমেজ আজ যান্ত্রিকতায় বন্দি।
যাত্রাপালা ও পুতুলনাচ : বিনোদনের আদি আঙিনাশীতের রাতে খোলা মাঠে সামিয়ানা টাঙিয়ে বসত যাত্রাপালার আসর। ‘বিবেক’ যখন তার গম্ভীর সুরে গান গাইত, তখন গোটা গ্রামের মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনত। একইভাবে মেলায় দেখা যেত পুতুলনাচ। সামাজিক বার্তা আর লোককথার মিশেলে এই মাধ্যমগুলো ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতির দর্পণ। আজ ডিশ এন্টেনা আর ইউটিউবের যুগে সেই যাত্রার দলগুলো অস্তিত্ব সংকটে।
গ্রামীণ খেলাধুলা : নৌকাবাইচ ও লাঠিখেলানদীমাতৃক বাংলায় বর্ষাকালে নৌকাবাইচ ছিল সবচেয়ে রোমাঞ্চকর উৎসব। সারি গান গেয়ে মাঝিদের নৌকার সেই তীব্র গতি দেখার জন্য নদীর দুই পাড়ে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করত। অন্যদিকে মেলায় বা বিশেষ অনুষ্ঠানে হতো লাঠিখেলা। বীরত্বের এই প্রদর্শনী এখন কেবল বিশেষ দিনগুলোতে কোনোমতে টিকে আছে।
হালখাতা ও লোকজ মেলাপহেলা বৈশাখের প্রধান আকর্ষণ ছিল হালখাতা। মিষ্টিমুখ আর লাল মলাটের নতুন খাতা খোলার মাধ্যমে যে সামাজিক সেতুবন্ধন তৈরি হতো, তা আজ অনলাইন পেমেন্ট আর ডিজিটাল লেনদেনের ভিড়ে হারিয়ে গেছে। আগে গ্রাম্য মেলাগুলোতে পাওয়া যেত মাটির পুতুল, নাগরদোলা আর খই-বাতাসা। এখন মেলার সেই ‘মাটির টান’ প্লাস্টিকের খেলনায় ঢেকে গেছে।
আমাদের উৎসবগুলো ছিল মূলত সাম্য ও সম্প্রীতির প্রতীক। আধুনিক জীবনযাত্রায় আমরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ায় এবং নগরায়নের প্রভাবে আমরা উৎসবের সেই খোলা আকাশ হারিয়ে ফেলেছি। লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল বিনোদন হারানো নয়, বরং আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
সংস্কৃতি হলো মানুষের পরিচয়। আমরা যদি আমাদের উৎসবগুলো টিকিয়ে রাখতে না পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক কৃত্রিম পৃথিবীতে বেড়ে উঠবে যেখানে মাটির কোনো ঘ্রাণ থাকবে না।”
এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। যদি আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে পাড়ায় পাড়ায় ছোট পরিসরে হলেও নবান্ন উদযাপন করি কিংবা হারিয়ে যাওয়া খেলাধুলার আয়োজন করি, তবে হয়তো প্রাণের মেলাগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাবে। মনে রাখা দরকার, আমাদের এই লোকজ উৎসবগুলোই আমাদের বিশ্বদরবারে অনন্য করে তোলে।
লেখক: হেনা শিকদার, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়




