চামড়া সংগ্রহে অনাগ্রহে ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা

ইনসাইড বাংলা ডেস্ক চামড়া সংগ্রহে অনাগ্রহে ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরাট্যানারি মালিকদের কাছে অনেকটাই জিম্মিদশার হাত থেকে বের হতে পারছেনা বগুড়ার চামড়া শিল্প ব্যবসায়ী মালিকেরা। নগদ টাকা দিয়ে মাঠ পর্যায় থেকে চামড়া কিনে সেগুলো বাকিতে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করতেন বগুড়ার চামড়া ব্যবসায়ীরা। বকেয়া আদায়

ই

ইনসাইড ডেস্ক

Inside Bangla

২৬ মে, ২০২৬
পড়তে ৫ মিনিট

চামড়া সংগ্রহে অনাগ্রহে ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা
ছবি: Inside Bangla
Aa

ইনসাইড বাংলা ডেস্ক

চামড়া সংগ্রহে অনাগ্রহে ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরাট্যানারি মালিকদের কাছে অনেকটাই জিম্মিদশার হাত থেকে বের হতে পারছেনা বগুড়ার চামড়া শিল্প ব্যবসায়ী মালিকেরা। নগদ টাকা দিয়ে মাঠ পর্যায় থেকে চামড়া কিনে সেগুলো বাকিতে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করতেন বগুড়ার চামড়া ব্যবসায়ীরা। বকেয়া আদায়ের লক্ষ্যে নতুনভাবে আবারও চামড়া কিনে বারবার ট্যানারি মালিকদের কাছে পাঠালেও অর্থগুলো ফেরত পাচ্ছেনা। এখন পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপনআপনার বিজ্ঞাপন এখানেবিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

এ জেলার ব্যবসায়ীদের প্রায় ৩২ কোটি টাকার বেশি বকেয়া রয়েছে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ট্যানারি মালিকদের কাছে। বকেয়া আদায় না হওয়ায় পুঁজি সংকটে নতুন করে চামড়া কেনার আগ্রহ হারাচ্ছে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ।

তারা বলছেন, ট্যানারী মালিকদের কাছে টাকা আটকে যাওয়ায় বগুড়ায় চামড়া ব্যবসায়ীদের অনেকেই পেশা বলদ করে রিক্সা চালাচ্ছেন, কেউ বা কাজ করছেন দিন মজুরের। দীর্ঘদিন পাওনা টাকা না পেয়ে অনেকে আবার প্রহরীর কাজও নিয়েছেন ঢাকায়।

বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি সূত্র জানিয়েছেন, ট্যানারি মালিকেরা বছরের পর বছর ধরে টাকা আটকে রাখা হয়েছে। গত দুই বছর সেই টাকা পরিশোধ করার জন্য ব্যসায়ীরা বগুড়া জেলা প্রশাসনের শরণাপন্ন হলেও তার ফল আরও উল্টো হয়েছে। ট্যানারি মালিকরা আগের ২২ কোটি টাকা তো পরিশোধ করেইনি আরও নতুন করে ১০ কোটি টাকা বকেয়া ফেলেছে। ফলে তাদের কাছে পাওনা ৩২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

ঈদুল আজহা সামনে রেখে সরকার রাজধানীর বাইরে লবনযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা বর্গফুট, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। আর ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।

চামড়া ব্যবসায়ীরা বলেন, সরকার ঘোষণা দেয়ার আগে ছিল ৭০০ টাকা বস্তা। এখন পার বস্তা ৭৪ কেজি লবণ হয়ে গেছে সাড়ে ৯০০ টাকা। তো এখন আমরা যদি সরকার থেকে লবণও না পাই, লবণের দামও বাড়তি হবে তাহলে চামড়ার দামও হবে। তো চামড়া বিক্রি করতে পারবে না। তো এখন আমরা তো অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে। যদি লবণের দাম বেড়ে যায় তাহলে লবণের কষ্ট চামড়াতেই উঠবে। একটা লবণের বস্তা ৭৪ কেজি। তাহলে প্রতি চামড়াতেই ৩০-৪০ টাকা বাড়তি ওটাতে কষ্ট বেড়ে যাবে। মাঝারি আকারের একটি চামড়া সংরক্ষণে গড়ে লবণ লাগে ৮ থেকে ১০ কেজি।

তাছাড়া চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে প্রণোদনার লবণ দেওয়া হলেও আড়তদারদের কোনো লবণ দেওয়া হয় না। অথচ মাত্র ১০ শতাংশ চামড়া মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলো সংগ্রহ করে থাকে। বাকি ৯০ শতাংশ চামড়া আড়তদাররা সংগ্রহ করে থাকেন। সেই হিসেবে বগুড়া জেলায় এবার কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের জন্য সামগ্রিক লবণের চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ মেট্রিক টন। সাধারণত একটি গরুর চামড়া সংরক্ষণে ৭ থেকে ১০ কেজি এবং ছাগল/ভেড়ার চামড়ার জন্য দেড় থেকে দুই কেজি লবণের প্রয়োজন হয়।

বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, বগুড়ার ১২ উপজেলায় এবার কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮০টি। বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৩৭টি পশু। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২ লাখ ৯২ হাজার ৯৫৭টি পশু বেশি রয়েছে। প্রস্তুত পশুর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯০৪টি ষাঁড়, ৪১ হাজার ৩২৮টি বলদ, ৬৩ হাজার ৫৫২টি গাভী, ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৫৬৯টি ছাগল, ৫৪ হাজার ২৯টি ভেড়া এবং ২ হাজার ১৫৫টি মহিষ।

বগুড়ার চামড়া ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও আশপাশের জেলার বিভিন্ন উপজেলার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কেনেন। কিন্তু সেই চামড়া সঠিক দামে সঠিক সময়ে বিক্রি করতে পারেন না। ট্যানারি মালিকদের বেঁধে দেওয়া দামে চামড়া কিনে লবণ দিয়ে প্রক্রিয়া করার পর তাদের বাঁকিতে চামড়া বিক্রি করতে হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান খান বলেন, জেলায় প্রতিবছরই কোটি কোটি টাকার চামড়া কেনাবেচা হয়। চামড়ার দাম কম হওয়ায় এবং লবনাক্ত চামড়ায় নানা ক্রটি তুলে ধরে ট্যানারি মালিকেরা বছরের পর বছর ধরে আমাদের চামড়া দাম বকেয়া রাখেন। এতে করে পুঁজির সংকটে রয়েছে আমাদের মতো ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।

অন্যদিকে ট্যানারী মালিকের কাছে ‘আমাদের প্রায় ৩২ কোটি টাকার বেশি বকেয়া পড়ে আছে। বকেয়া টাকা আদায়ে সমিতির পক্ষ থেকে সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।’ কিন্তু কাজ হচ্ছেনা।

তিনি আরও বলেন, জেলার মধ্যে চামড়া বড় ব্যবসা হয় জেলা সদর ও শেরপুর উপজেলায়। শেরপুরে প্রতিবছর প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার চামড়ার ক্রয়-বিক্রয় হয় । সবমিলিয়ে জেলায় অন্তত ৪০-৫০ কোটি টাকার চামড়ার কেনাবেচা হয়। “এবার লবনযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা বর্গফুট নির্ধারণ করায় আর্থিক ট্রান্সজিট বেশী হবে বলে আশা করি।” তাছাড়া ভালো মানের চামড়ার চাহিদা থাকলেও প্রায় ৫০ শতাংশ চামড়া মানসম্মত নয়।

এদিকে কোরবানির পশুর চামড়া কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানার অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস। এ আয় দিয়ে বছরজুড়ে এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের খাবার, আবাসন ও শিক্ষার ব্যয় মেটানো হয়। জেলার ১২ টি উপজেলার এতিমখানা, মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোডিং মিলে ১৩৭টি প্রতিষ্ঠানের ৯০ মে.টন লবন বিতরণ হয়েছে। চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পেলে এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ নিয়ে শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নিয়াজ কাযমির রহমান বলেন, ‘উপজেলায় কোরবানিযোগ্য পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। এ বছর উপজেলায় কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ৭৬ হাজার ৭২৯টি। বিপরীতে চাহিদা ৫৫ হাজার ৩২৯টি। ফলে ২১ হাজার ৪০০টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। এ বছর পশুর উৎপাদন ভালো হয়েছে। খামারিদের প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির কারণে স্বাস্থ্যসম্মত পশু প্রস্তুত করা সম্ভব হয়েছে। আশা করছি, খামারিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।

ইদুল আযহার দিনে চামড়া কেনাবেচায় যেহেতু অন্যতম জেলার শেরপুর উপজেলা। সেই চামড়া সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি নিয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, ‘পৌরসভাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কোরবানির দিনই বর্জ্য অপসারণের জন্য। চামড়া সংরক্ষণে বিশেষ কর্মশালা করা হয়েছে। লবণ বিতরণ করা হয়েছে। চামড়া পাচার রোধে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে জেলা বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক একেএম মাহফুজুর রহমান জানান, ইদুল আযহায় চামড়া সংগ্রহ ও কেনাবেচার অন্যতম মার্কেট বগুড়া। এবার জেলা প্রশাসক মহোদয়ের মাধ্যমে জেলার ১২টি উপজেলার স্ব-স্ব নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে প্রায় ১৩৭টি এতিমখানা, মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোডিং এ ৯০ মেট্রিক টন লবন বিতরণ করা হয়েছে। “এবার সরকারিভাবে চামড়ার মূল্য যেহেতু বৃদ্ধি করা হয়েছে, সেহেতু চামড়ার বাজারে ব্যবসায়ীরা বেশী মূল্য পাবেন বলে আশা রাখছি।”

এই খবরের মূল কথা

    একই বিষয়ের আরও খবর

    আরও পড়ুন