অনুমোদনের পরও ৬৬ শ্রমিকের চাকরি নিয়মিত হলো না
কেউ ২৮ বছর, কেউ ২১ বছর ধরে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে শ্রমিক হিসেবেই কাজ করছেন। আদালত তাদের চাকরি নিয়মিতকরণের নির্দেশনা দিলেও দীর্ঘ দিনেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অবশেষে সম্প্রতি তাদের চাকরি নিয়মিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল বোর্ড। বোর্ডসভায় তা অনুমোদনও হয়। কিন্তু শেষ মূহুর্তে প্রক্রিয়াটি আটক
ইনসাইড ডেস্ক
Inside Bangla
৬ মার্চ, ২০২৬
পড়তে ৩ মিনিট

কেউ ২৮ বছর, কেউ ২১ বছর ধরে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে শ্রমিক হিসেবেই কাজ করছেন। আদালত তাদের চাকরি নিয়মিতকরণের নির্দেশনা দিলেও দীর্ঘ দিনেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অবশেষে সম্প্রতি তাদের চাকরি নিয়মিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল বোর্ড। বোর্ডসভায় তা অনুমোদনও হয়। কিন্তু শেষ মূহুর্তে প্রক্রিয়াটি আটকে গেছে।
এতদিনের কষ্টের জীবন শেষ হওয়ার খুশিতে শ্রমিকদের মুখে যখন একটু হাসি ফুটছিল, তখনই তা আবার ফিকে হয়ে গেছে। এরই মধ্যে গেল শনিবার মনিরুল ইসলাম দুলাল নামের এক শ্রমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাঁর সহকর্মীরা বলছেন, সব প্রক্রিয়া শেষেও চাকরি নিয়মিত না হওয়ার বিষয়টি সহ্য করতে পারেননি মনিরুল। তাই স্ট্রোকে মারা গেছেন তিনি। মনিরুল ইসলাম ২৮ বছর ধরে বোর্ডের শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে শিক্ষা বোর্ডে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে ৬৬ জন নিয়োগ পান। প্রত্যেকের পদ চতুর্থ শ্রেণির এমএলএসএস। তাদের দৈনিক মজুরি এখন ৭৫০ টাকা। ইতোমধ্যে বোর্ডে আগে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া ৩৮ জন আইনি লড়াই করে চাকরি নিয়মিত করেছেন। তাই এই ৬৬ জনও ২০১৪ সালে আইনি লড়াইয়ে যান। উচ্চ আদালত ২০১৪ সালে ৯০ দিনের মধ্যে তাদের চাকরি নিয়মিত করার আদেশ দেন। কিন্তু শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ আদেশ বাস্তবায়ন না করে আপিল করে। পরে ২০১৭ সালে আপিল বিভাগ রায় দেন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। সেক্ষেত্রে মানবিক কারণে এই শ্রমিকেরা অগ্রাধিকার পাবেন।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা বোর্ডে কোনো নিয়োগই হয়নি। শ্রমিকদেরও চাকরি নিয়মিত হয়নি। আওয়ামী সরকারের পতনের পর বোর্ডে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে আসেন অধ্যাপক আ.ন.ম. মোফাখখারুল ইসলাম। শ্রমিকেরা তাঁর কাছে গিয়ে তাদের চাকরি নিয়মিত করার অনুরোধ করেন। এতদিন পর চেয়ারম্যান তাদের প্রতি সদয় হন। তিনি চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি নোটিশ বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। অভ্যন্তরীণ বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটিও করা হয়।
এরপর গত ১৯ ও ২০ জানুয়ারি কমিটি শ্রমিকদের মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে। মৌখিক পরীক্ষা শেষে এই শ্রমিকদের চাকরি নিয়মিত করার সিদ্ধান্ত হয়। বিষয়টি ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বোর্ডসভায় অনুমোদনও পায়। এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরীর কাছে শ্রমিকেরা যোগদানপত্রও দেন। কিন্তু এখনও তাদের নিয়মিত করা হয়নি।
শ্রমিকেরা জানান, ১৫ ফেব্রুয়ারি যোগদানপত্র জমা দেওয়ার সময় সচিব তাদের বলেছিলেন মাসের অর্ধেক তারা আগের নিয়মে দৈনিক মজুরির শ্রমিক হিসেবেই পারিশ্রমিক পাবেন। আর বাকি অর্ধেক মাসের বেতন তারা পাবেন নিয়মিত কর্মচারী হিসেবে। কিন্তু মাস শেষে তারা জানতে পারেন, আগের মতোই পুরো মাসের মজুরি ছাড় হয়েছে। এতে শ্রমিকেরা চরম হতাশার মধ্যে পড়েছেন। তাদের দাবি, এই নিয়োগে বোর্ডের কিছু প্রভাবশালী স্থায়ী কর্মকর্তা বাইরে থেকে তাদেরও লোকজনকে ঢোকাতে চাচ্ছিলেন। বোর্ডের চেয়ারম্যান এতে সম্মত না হওয়ায় শ্রমিকদের চাকরি নিয়মিত করতে দেননি তারা।
মজুরিভিত্তিক শ্রমিক মোসাদ্দেক হোসেন জনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ দিন ধরে ঝুলে আছি। সামান্য মজুরিতে কাজ করি। আমরা মানবেতর জীবন কাটাই। আদালতের আদেশ থাকলেও বোর্ড আমাদের চাকরি নিয়মিত করেনি। ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের পর আমরা আশায় বুক বেধেছিলাম। বোর্ড সকল প্রক্রিয়া শেষও করেছিল। কিন্তু শেষমূহুর্তে একটি দুষ্টচক্রের কারণে আমাদের নিয়োগটা আটকে গেছে। এতে আমরা চরম হতাশার মধ্যে পড়েছি।’
বোর্ডের আরেক শ্রমিক জাকারিয়া নয়ন বলেন, ‘বোর্ডসভায় অনুমোদনের পর সচিব আমাদের যোগদানপত্রও নিয়েছেন। এরপরও আমাদের চাকরি নিয়মিত হয়নি। এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আমাদের সহকর্মী মনিরুল ইসলাম দুলাল স্ট্রোক করে মারা গেছেন। এই পর্যায়ে এসেও যদি আমাদের চাকরি নিয়মিত না হয় তাহলে আত্মহত্যা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।’
জানতে চাইলে সচিব অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী বলেন, ‘যোগদানপত্র শ্রমিকেরাই স্বপ্রণোদিত হয়ে দিয়ে গেছেন। আমরা চাইনি। তাদের চাকরিটা এখন নিয়মিতকরণ হচ্ছে না।’
চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ.ন.ম. মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু ইন্টার্নাল সমস্যা আছে। আমরা মানবিক কারণে তাদের চাকরিটা নিয়মিত করার উদ্যোগ নিলেও পারছি না।’




